ঢাকা শুক্রবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৭


বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাঃ প্রাসঙ্গিক ভাবনা।

সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির :এইচএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণদের কিছু দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। আজ থেকে ৩২ বছর আগে ১৯৮৫ সালে এ ধরনের ভর্তি যুদ্ধে আমি নিজেও অংশ নেই। ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। মূলত পরীক্ষার ভাল ফলাফলের উপরই অনেকাংশে নির্ভর করে ভাল প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ। ভাল ফলাফলধারী ছাত্র-ছাত্রীদের স্বভাবতই আগ্রহ থাকে আকর্ষণীয় কোন বিষয়ের উপর পড়ালেখা করার। এজন্য তাদেরকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

আজকাল আবার এইচএসসি ও সমমান পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের বিদেশের নামকরা বিশ্ব বিদ্যালয় পড়ার আগ্রহ ও সুযোগ বেড়েছে। এক্ষেত্রে ইংলিশ মিডিয়ামে অধ্যয়নরতরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। তবে এইচএসসি উত্তীর্ণ অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদেরই বাস্তব সঙ্গত কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। এইচএসসি পরীক্ষা পাশের পর আমাকে নিয়ে বাড়িতে বড়দের সভা হয়। আমি কোথায় ভর্তি হবো সে নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা। আমি কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির হওয়ায় প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার কথা খুব একটা ভাবা হয় না।

সিলেটের ভেতরে কোন একটি কলেজে ভর্তির বিষয়ে বড়দের মধ্যে অধিকাংশের মতামত পাওয়া যায়। আমাদের সময়ে আমার বন্ধুদের অনেকেই এমসি কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়। তারা অবশ্য পরবর্তীতে কলেজ থেকে অনার্স সমাপ্ত করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাষ্টার্স করার জন্য ভর্তি হয়। তখন এমসি কলেজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অধিভূক্ত কলেজ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত ছিল। যার জন্য অনার্স উত্তীর্ণরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টার্স পড়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়তে হতো না। বর্তমানে এমসি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

দেশের কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করার ইচ্ছে আমার ছিল। অবশেষে আমার ইচ্ছার পক্ষেই অনেকটা বাধ্য হয়ে বড়দের সিদ্ধান্ত হলো আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার! প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হবে। তাই চট্টগ্রামের পথে ট্রেনে উঠলাম, ভানুগাছ থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কী যে কষ্ট, বসার কোন সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। তখনও ট্রেনের ইন্টারসিটি ব্যবস্থা চালু হয়নি। কুমিল্লার পর বসার সিট পেয়ে অনেক শান্তি পেলাম!

চট্টগ্রাম পৌঁছে বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী যাত্রা করে একটা সময়ে শাহ আমানত হলে আমিন ভাইয়ের রুমে উঠলাম। সঙ্গে মালামাল বলতে একটি ছোট ট্রাংক ও ব্যাগ। অবশ্য আমার এই ট্রাংক নিয়ে বন্ধু মহলে কিছুটা হাসাহাসি হতো। ভাইয়ের সাথে একই বিছানায় ডাব্লিং করে থাকার ব্যবস্থা হয়। ভাই থাকায় এ যাত্রা আমার রক্ষা হলো। ভর্তি পরীক্ষার মাস খানেক সময় তখনও হাতে আছে। এতো সুন্দর ক্যাম্পাস ঘুরতে মন চাইলেও তা না করে আমি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলাম। ভাল প্রস্তুতি থাকায় পরীক্ষাও ভাল হয়। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হতো। যার জন্য ভর্তিচ্ছু প্রায় সকলেই একাধিক বিভাগে ভর্তির পরীক্ষা দিত। আমিও সাতটি বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেই। বিভাগের সমূহের কথা আজও মনে আছে। বাংলা, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতির বিজ্ঞান ও লোক প্রশাসন। এই প্রতিটি বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অনেক প্রস্তুতিও নিতে হয়। সবকটি বিভাগের পরীক্ষাতেই আমি উত্তীর্ণ হই। ভর্তির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি মাত্র বিভাগ বেছে নিতে হবে বিধায় লোকপ্রশাসন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে পরিচিত অনেকের সাথে দেখা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে সিলেট সরকারী কলেজের অধ্যাপক রইছ উদ্দিন স্যারের সাথে দেখা হয়ে। স্যার কোন একটা কাজে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তিনি আমাকে দেখে খুশী হন এবং তাঁর বন্ধু চবির রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মজিদ স্যারের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষে এক পর্যায়ে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ঢাকায় আসলাম। জাবিতে থাকার ব্যবস্থা হলো মীর মোশাররফ হোসেন হলে শাহেদ ভাইয়ের রুমে। খুব সুন্দর থাকার ব্যবস্থা, খাওয়া দাওয়ারও কোন সমস্যা নেই। পরীক্ষা দিলাম, আবদাল ভাইয়ের সাথে দেখা হলো। দুনিয়া যে কত মজার জায়গা। পরবর্তীতে আমার আত্মীয়তা হয় আবদাল ভাই ও শাহেদ ভাইয়ের সাথে। আবদাল ভাই আমার ভায়রার ভাই, আর শাহেদ ভাই শ্যালিকা ছুট্রির দেবর। তারা দু’জনই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। যা দেখে আমার খুব ভাল লাগে।

জাবিতে পরীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য জিগতলায় খালাত বোন বানু আপার বাসায় গেলাম। বানু আপার বাসায় থাকা, খাওয়া, আড্ডার ভাল ব্যস্থা ছিল। আমি এ সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। এক সপ্তাহ তাদের বাসায় থেকে গেলাম। ভাগ্নে সেলিম, ভাগনি জলি আমার সমবয়সী হওয়ায় মজা করে দিন কাটত। আপা ও দুলা ভাই খুবই চমৎকার মানুষ। আর ভাগনি জলির হাতে মজার চা ছিল বাড়তি পাওয়া। আপা ও দুলা ভাই দুনিয়াতে এখন নেই, তাঁদের কথা খুব মনে পড়ে। আমার ভাগ্নে, ভাগনি সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। যা খুবই ভাল লাগার বিষয়।

বানু আপার বাসায় থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। ঢাবিতে অপেক্ষামান তালিকায় নাম ছিল। কিন্তু ভাগ্নে সেলিমের এক কথায় প্রভাবিত হয়ে জাবিতে আর ভাইভা পরীক্ষা দেওয়া হলো না। এ অবস্থায় আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তির হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার মজাই আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টি, বিতরণ ও অনুশীলনের জায়গা যা জ্ঞান আদান প্রদানের একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বটে। শ্রেনীকক্ষের বাইরে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মননশীলতাও বিকশিত হয়। প্রতি বছর এইচএসসি পাশের পর ভর্তি যুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নেয়। এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৯ লক্ষ ৬৪ হাজার ৯৩৮ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪২ জন। তবে কারিগরি, মাদ্রাসাসহ ১০ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭০ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ১ হাজার ৭১১ জন। ১০টি বোর্ডে মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন (সূত্র: প্রথম আলো- ২৪ জুলাই ২০১৭)।
সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের সম্মান প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হবে। যা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শেষ হবে।

মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৬ অক্টোবর ও ১০ নভেম্বর। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। এজন্য গত ২৪ আগষ্ট থেকে আবেদন শুরু হয়েছে (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ৭ সেপ্টম্বর ২০১৭)।

সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় আসন স্বল্পতা থাকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভর্তি পরীক্ষায় তুমুল প্রতিযোগীতার সম্মুখীন হতে হয়। ভর্তির পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও বেশ কষ্ট সহ্য করতে হয়। তারপরও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারাটাই তাদের জন্য বড় স্বার্থকতা।

ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সকলের প্রতি আমার শুভেচ্ছা। হাতে সময় খুব কম, তোমরা বেশী করে পড়ালেখা করো, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলো, আশা করি তোমাদের পরিশ্রম কাজে লাগবে। আর প্রত্যেক অভিভাবক ও শিক্ষকদের কথা মন দিয়ে শুনো, এতে করে তোমাদের কল্যাণ হবে।

সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির
অতিরিক্ত রেজিষ্টার
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

আরো খবর পড়ুন

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Print this page