ঢাকা শুক্রবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৭


রবিবারের সমাবেশ ঘিরে ঢাকামুখী বিএনপির নেতাকর্মীরা

গত বছরের পহেলা মের পর রাজধানীতে বিএনপিকে ছোট-বড় কোনো সমাবেশ করতে দেয়নি প্রশাসন। দীর্ঘ ১৯ মাস পর রবিবার রাজধানীতে সমাবেশ করতে যাচ্ছে মামলা-হামলায় কোণঠাসা দলটি। এ যেন রাজধানীতে তাদের মুক্তির বারতা। ফলে নেতাকর্মীদের মাঝে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।

রবিবারের সমাবেশে নেতাকর্মীদের ব্যাপক সমাগম নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে সারা হয়েছে সার্বিক প্রস্তুতি। ঢাকা ও আশপাশের জেলার নেতাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। সমাবেশে যোগ দিতে দূরবর্তী জেলার অনেক নেতাকর্মীও এখন ঢাকামুখী।

দলসূত্রে জানা গেছে, মূলত ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার নেতাদের কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে কর্মীদের নিয়ে যথাসময়ে সমাবেশে উপস্থিত হতে। এসব জেলার নেতাদের অনেকে ইতিমধ্যে ঢাকায় চলে এসেছেন। বেশির ভাগ নেতাকর্মী রবিবার সকালে ঢাকার পথে রওনা হবেন বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রের কোনো নির্দেশনা না থাকলেও দূরবর্তী জেলার নেতারা ঢাকায় আসছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। জেলা-উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের সূত্রমতে, কেউ কেউ নিজের অনুসারী নেতাকর্মীদেরও সঙ্গে আনবেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই আগামী নির্বাচনের মনোনয়ন-প্রত্যাশী।

তবে অতীতের মতো পথে যাতে কোথাও কোনো ধরনের বাধা কিংবা সমস্যায় পড়তে না হয় সেজন্য নেতাকর্মীদের বিছিন্নভাবে ঢাকায় আসতে বলা হয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে ঢাকায় চলে এসেছেন। যেমন বরগুনার বেতাগী উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান কবির ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।

অধ্যাপক জাকির হোসেন  বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দল সমাবেশ করছে। এখান থেকে নিশ্চয়ই নির্দেশনামূলক বক্তব্য পাব। তাই একজন কর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেই সমাবেশে যোগ দিতে এসেছি।’

সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন ফেনী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নঈম উল্লাহ চৌধুরী বরাত।  তিনি বলেন, ‘সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ফেনী থেকে বিএনপি বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসছেন। অনেকে চলে এসেছেন, অনেকে এখনো পথে আছেন। কোনো ধরনের সমস্যায় যাতে পড়তে না হয়ে সেজন্য বিছিন্নভাবে আসার নির্দেশনা আছে।’

এর আগে বেশ কবার ঢাকায় আহূত বিএনপির সমাবেশ ঘিরে রাজধানীকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল পরিবহন বন্ধ করে দিয়ে। এ জন্য অভিযোগের আঙুল উঠেছিল সরকারের দিকে। তাই এবার সতর্ক বিএনপির নেতাকর্মীরা।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ পিন্টু সমাবেশ উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন জানিয়ে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এই সমাবেশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দলের চেয়ারপারসন নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেবেন আশা করি। যা পরবর্তিতে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেব।’

সবশেষ ২০১৬ সালের ১ মে রাজধানীতে শ্রমিক দিবস উপলক্ষে শ্রমিক সমাবেশ করে বিএনপি। এর আগে ওই বছরের ৫ জানুয়ারি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার সুযোগ পায় দলটি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের দুই বছর পূর্তিতে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে সেই সমাবেশ করে বিএনপি। এরপরে রাজধানীতে সমাবেশ করার সুযোগ পায়নি ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সরকার গঠনকারী দলটি।

৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে কাল রবিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশে বিএনপি-প্রধান খালেদা জিয়া দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেবেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

প্রথমে ৮ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে চেয়েছিল বিএনপি। তবে সিপিএ সম্মেলনের কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ৯ নভেম্বরের পর সমাবেশ করার পরামর্শ দেয়। এরপর ১১ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি। তবে যুবলীগের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেদিন সোহরাওয়ার্দীতে অনুষ্ঠান থাকায় ১২ নভেম্বর ঠিক করে বিএনপি।

সমাবেশের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমে মৌখিক ও পরে ২৩ শর্তসহ লিখিত অনুমতি পেয়েছে দলটি। যদিও শুরু থেকেই এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাবেশ করার অনুমতি মিলবে এমন আভাস পেয়ে প্রস্তুতি অনেকটা সেরে রেখেছে দলটি।

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, সম্প্রতি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে এবং রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য কক্সবাজার যাওয়ার পথে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের যে সমাগম হয়েছিল তা রবিবারের সমাবেশেও দেখা যাবে।

দলের পক্ষ থেকে তেমন প্রচারণা না থাকলেও নীরবে নেতাকর্মীরা সমাবেশ সফল করতে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমাবেশ সফল করতে সবাইকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন অনেকে। এসব কারণে তারা মনে করছেন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে আসবেন।

ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন-প্রত্যাশীরা।

গাজীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মাযহারুল ইসলাম  বলেন, ‘সমাবেশের উদ্দেশে আমি ঢাকা এসেছি। সমাবেশে ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আমরা আগেই প্রস্তুতি সেরে ফেলেছি। অনেক নেতাকর্মী নিজেদের উদ্যোগে ইতিমধ্যে ঢাকা এসেছেন। অনেকে আজ সকালে আসবেন।’

সমাবেশে উপস্থিতি নিয়ে বিএনপির ভাবনা জানতে চাইলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আগামীকাল (রবিবার) জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।’

এদিকে সমাবেশ সফল করতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। যেকোনো মূল্যে সমাবেশকে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ করতে জোর চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। সে লক্ষ্যে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ অন্যান্য সংগঠন নিজেদের মতো করে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় সংগঠন ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ, ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি জেলার নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কয়েক দফা প্রস্ততি সভা করেছে দলটি।

সমাবেশ মঞ্চ সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকা বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘এই সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হবে। আমাদের মূল দল ছাড়াও সব অঙ্গসংগঠন আর সাধারণ মানুষের ঢল নামবে এই দিন। শুধু বিএনপিই নয়, আস্থার জায়গার কারণে সাধারণ জনগণ সমাবেশে আসবে। আমরা আশা করি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই সমাবেশ থেকে হতাশাগ্রস্ত জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিবেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে। সরকারের শোষণ, নিপীড়নের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। এ কারণে মানুষ বিএনপির সমাবেশে অংশগ্রহণ করবে। এই সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তো থাকবেই, তবে জনগণের উপস্থিতি অন্য সব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে।’

নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান বলেন, ‘অনেক দিন পর সমাবেশ করছি। আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছি। সব পর্যায়ের নেতাকর্মী, সমর্থক স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নেবেন। সংখ্যা বলতে চাই না, তবে আমরা আমাদের সামর্থে্যর সবটুকু উজাড় করে দেব। কারণ এটা বেগম খালেদা জিয়ার সমাবেশ। সেই লক্ষে আমরা যে যার জায়গা থেকে কাজ করছি ।’

আরো খবর পড়ুন

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Print this page